আবুজার গিফারী :
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮১ কিলোমিটার নদী খনন এবং ভবদহের বিভিন্ন স্লুইসগেট সংস্কারের কাজ সম্পন্ন হলেও যশোর ও খুলনার ভবদহ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। বরং গত বছরের তুলনায় চলতি বছর আরও আগেই অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুর, ফুলতলা ও ডুমুরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে, তলিয়ে গেছে কৃষিজমি, মাছের ঘের, বসতভিটা, রাস্তাঘাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
এই পরিস্থিতিতে ভবদহ অঞ্চলের স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসন, টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) বাস্তবায়ন এবং পানিবন্দী মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় ৭ দফা দাবিতে যশোর */জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক-জনতা ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
সোমবার (৩ আগস্ট) সকাল ১১টায় ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। গণঅবস্থান শেষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে কৃষক মুক্তি সংগ্রাম, নড়াইল-যশোর শাখা। সংগঠনটির উদ্যোগে অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষক প্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ভবদহের জলাবদ্ধতা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা, নদী-খাল ভরাট, পলি জমে নদীর নাব্যতা হ্রাস এবং স্থানীয় জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে প্রকল্প বাস্তবায়নের ফল। শত শত কোটি টাকা ব্যয় করেও যদি মানুষ বছরের পর বছর পানিবন্দী থাকে, তাহলে সেই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বক্তারা আরও বলেন, ভবদহের মানুষ বারবার আশ্বাস পেলেও বাস্তবে স্থায়ী কোনো সমাধান পায়নি। প্রতি বর্ষায় হাজার হাজার একর কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যায়, নষ্ট হয় ফসল, বন্ধ হয়ে যায় কৃষিকাজ। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়। শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়, বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয় এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। এ অবস্থায় ভবদহ অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের সাংবিধানিক ও ন্যায্য অধিকার।
বক্তারা অভিযোগ করেন, জনগণের অর্থে পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও কার্যকর ফল না পাওয়ায় মানুষের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে। তারা বলেন, নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং বৈজ্ঞানিকভাবে টিআরএম বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
সমাবেশ থেকে সরকারের কাছে ৭ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— জনগণের মতামতের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে বিলে বিলে টিআরএম বাস্তবায়ন, নদী খননের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, জরুরি ভিত্তিতে আমডাঙ্গা খাল সংস্কার ও প্রশস্তকরণ, খর্ণিয়া থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত জমে থাকা পলি দ্রুত অপসারণ, নদী ও খালে থাকা প্রয়োজনীয় নয় এমন আড়বাঁধ অপসারণ করে পানি নিষ্কাশনের পথ উন্মুক্ত করা, পানিবন্দী মানুষের জন্য জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কৃষকরা বলেন, বছরের পর বছর জলাবদ্ধতার কারণে তারা আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। কৃষি, মৎস্য ও গবাদিপশু খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবদহ অঞ্চলের অর্থনীতি ও জনজীবন আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।
গণঅবস্থান কর্মসূচিতে অভয়নগরের কালিশাকুল, মশিয়াঘাটী ও বালিধা, মনিরামপুরের লখাইডাঙ্গা, সুজাতপুর ও কপালিয়া এবং কেশবপুরের খুকশিয়া, ডুমুরখালিসহ ভবদহ বিলসংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামের বিপুল সংখ্যক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, মৎস্যচাষি, নারী-পুরুষ ও সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।
শেষে আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন, ভবদহ অঞ্চলের স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ইব্রাহিম হোসেন। ফোন নম্বর: 01735936753। Office: বাড়ি #20;রোড #6;ব্লক #ই; মিরপুর#১২; পল্লবী, ঢাকা।