কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: নিজাম উদ্দীন
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার ৭নং ওয়ার্ডের পূর্ব তারাপাশায় অবস্থিত কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বর্তমানে এক মারাত্মক সমস্যার মুখে পড়েছে। বিদ্যালয়ের একমাত্র খেলার মাঠে দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পানি জমে রয়েছে। খেলাধুলা করার জন্য নির্ধারিত এই মাঠটি এখন স্থায়ী জলাশয়ে রূপ নিয়েছে। শিক্ষার্থীরা যেখানে দৌড়ঝাঁপ করে আনন্দ করার কথা ছিল, সেখানে এখন কিছু মানুষ মাছ ধরছে। ফলে শিশুদের মনোজগত চাপে পড়ছে, আর অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, মাঠে প্রয়োজনীয় মাটি ভরাট ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো মাঠ প্লাবিত হয়। শুষ্ক মৌসুমেও পানি শুকাতে সময় লাগে, আর বর্ষায় তো মাঠ একেবারেই জলাশয়ে পরিণত হয়। ছোট ছোট শিশুরা এই মাঠে এসে খেলাধুলার পরিবর্তে কেবল পানিভর্তি দৃশ্য দেখে হতাশ হয়। মাঠে একসময় কোলাহল থাকলেও এখন নীরবতা, কেবল মাঝে মাঝে শোনা যায় মাছ ধরার মানুষের আওয়াজ৷
শিক্ষার্থীদের হতাশা হয়ে বলছেন– আমাদের মাঠ নেই৷৷ বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, তারা প্রতিদিন মাঠে খেলতে আসতে চাইলেও মাঠ পানিতে ভরা থাকায় খেলা সম্ভব হয় না। একজন ক্ষুদে শিক্ষার্থী কষ্টের সুরে বলল— “আমরা মাঠে ফুটবল খেলতে চাই, কিন্তু এখানে শুধু পানি আর মাছ। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি শিশুদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস ও শিক্ষার প্রতি আগ্রহকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
অভিভাবকরা দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যার সমাধান দাবি করলেও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একজন অভিভাবক ক্ষোভের সঙ্গে বলেন— “আমাদের সন্তানরা মাঠে খেলতে পারছে না, অথচ শিক্ষা অফিস শুধু অভিযোগের কাগজ চাচ্ছে। এটা প্রশাসনের চরম গাফিলতি।”
এলাকাবাসীর দাবি, বিদ্যালয়ের মাঠে মাছ ধরা যেমন শিশুদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে, তেমনি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশকেও অসম্মানিত করছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবেন। তবে এলাকাবাসী পাল্টা অভিযোগ করে বলছেন, দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মৌখিকভাবে সমস্যা জানানো হলেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সচেতন মহল বলছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিশুদের মৌলিক অধিকার নিয়ে প্রশাসনের এমন নিষ্ক্রিয়তা দায়িত্বহীনতার স্পষ্ট প্রমাণ।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও শারীরিক সুস্থতার জন্য খেলাধুলার পরিবেশ অপরিহার্য। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা দলগত চেতনা, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস অর্জন করে। কিন্তু মাঠে খেলাধুলা না করতে পারায় এসব বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। এটি শুধু একটি বিদ্যালয়ের সমস্যা নয়, বরং পুরো প্রজন্মের সুস্থ বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
অভিভাবক ও এলাকাবাসী মাঠে মাটি ভরাট, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “যদি দ্রুত মাঠ সংস্কারের কাজ শুরু না হয়, তবে আমরা শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষার স্বার্থে বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবো।”
কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ আজ খেলাধুলার জায়গা না হয়ে মাছ ধরার আস্তানায় পরিণত হয়েছে। শিশুদের হাসি-আনন্দে ভরে ওঠার জায়গা আজ জলাবদ্ধতায় ডুবে আছে। প্রশাসনের অবহেলা যদি চলতেই থাকে, তবে এটি শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, বরং গোটা সমাজের জন্যই এক হতাশাজনক সংকেত।