সোহেল তানভির ঘোড়াঘাট উপজেলা প্রতিনিধি
আধুনিকতার ছোঁয়া ও তীব্র পুঁজি সংকটে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। একসময় গ্রামীণ জনপদের মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্রের একটি বড় অংশের জোগান দিতেন এই শিল্পের কারিগররা। তবে সময়ের বিবর্তনে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলের পণ্যের ব্যাপক ব্যবহারে মাটির তৈরি জিনিসের চাহিদা দিন দিন কমছে। ফলে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক মৃৎশিল্পী।
দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার শতাধিক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এসব পরিবারের সদস্যরা হাঁড়ি-পাতিল, সরা, কলস, খোড়া ও বিভিন্ন আকর্ষণীয় মাটির সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু বর্তমানে কাঁচামাল ও উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়লেও সে তুলনায় বাড়েনি পণ্যের দাম। ফলে চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা।
মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে চিটা ধানের বিনিময়ে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করতেন তাঁরা। সেই ধান দিয়েই পরিবারের সারা বছরের খাদ্যের চাহিদা মিটে যেত। কিন্তু এখন সেই চিরচেনা চিত্র আর নেই। বাজারে আধুনিক ও সস্তা উপকরণের পণ্যের সহজলভ্যতার কারণে মাটির তৈজসপত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।
বর্তমানে মাটির সামগ্রী তৈরির পর রোদে শুকিয়ে তা ভাটায় পোড়াতে হয়। জ্বালানি কাঠ ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এক খোলা মাটির পণ্য তৈরি করতেই ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। অথচ উৎপাদিত পণ্যগুলো বিক্রি করে খরচ বাদে তেমন কোনো লাভ থাকে না। ফলে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থায় পড়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন কারিগররা।
শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেক পরিবারের সদস্য শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে অন্য পেশাতেও সহজে যেতে পারছেন না। তাই হাজারো প্রতিকূলতা ও অভাব-অনটনের মধ্যেও পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যবাহী পেশাটি কোনোমতে আঁকড়ে ধরে আছেন তারা। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় পুঁজি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সরকারি সহায়তা পেলে এই শিল্পকে আবারও ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব।
ঘোড়াঘাট পৌরসভার প্রশাসক মো. আল মামুন কাওসার শেখ বলেন, “মৃৎশিল্পীদের আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি উপকরণ সরবরাহ করা গেলে তাঁরা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারবেন। পাশাপাশি মাটির তৈরি পণ্যের মান উন্নয়ন ও উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। সময়োপযোগী এসব উদ্যোগ নেওয়া গেলে মৃৎশিল্পীদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে এবং আমাদের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের পুনর্জীবন লাভ করা সম্ভব হবে।